সঞ্জীব ভট্টাচার্য্য : | রবিবার, ২১ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | 85 বার পঠিত
আজ বাবা দিবস। চারদিকে বাবাকে নিয়ে নানা আয়োজন দেখে মনটা বারবার ছুটে যাচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের উচালিয়াপাড়া গ্রামের আমাদের সেই চেনা বাড়িটায়। মনে পড়ছে তোমার স্নেহমাখা মুখখানি—আমার বাবা, স্বর্গীয় আশুতোষ চক্রবর্ত্তী। বাবা, তুমি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আমাদের প্রতিটি অর্জনে আর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তোমার শিক্ষা মিশে আছে। সেই সাথে অদৃশ্য আর্তনাদ- জীবদ্দশায় তোমার জন্য কিছুই করতে পারিনি।
তুমি ছিলে অত্যন্ত মেধাবী এবং পড়াশোনাপ্রেমী একজন মানুষ। নানা পারিবারিক ও সামাজিক কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের পড়াশোনা শেষ করতে না পারার একটা সুপ্ত কষ্ট তোমার মনে ছিল। হয়তো সেই কারণেই আমাদের পড়াশোনার ব্যাপারে তুমি ছিলে ভীষণ আন্তরিক। নিজের সৎ চাকরিজীবনের পুরোটা সময় তুমি আমাদের পেছনেই উৎসর্গ করেছ। স্কুলের বাঁধাধরা পড়ার বাইরেও যেন আমরা চমৎকার সব বই পড়ি, জ্ঞান অর্জন করি—সেজন্য তুমি সারাক্ষণ আমাদের দেখভাল করতে ও উৎসাহ দিতে।
তোমার সেই ত্যাগ আর যত্নের কারণেই আজ তোমার সব সন্তান শিক্ষিত এবং সমাজে স্বাবলম্বী। আমাদের ছোট বোন রুমা যখন সরাইল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথমবারের মতো কুমিল্লা বোর্ডে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৪র্থ ও মেয়েদের মধ্যে ১ম হওয়ার গৌরব অর্জন করল, তখন তোমার মুখে যে তৃপ্তির হাসি দেখেছিলাম—তা আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। আজ একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি যখন মানুষের সেবা করার সুযোগ পাই, তখন প্রতিমুহূর্তে তোমার শেখানো সততা আর নৈতিকতার কথাই আমার মনে পড়ে। মানুষের কল্যাণে কাজ করার এই মানসিকতা আমি তোমার কাছ থেকেই পেয়েছি।
শিক্ষার প্রতি তোমার এই আজীবন ভালোবাসাকে সম্মান জানাতেই ২০১২ সাল থেকে আমরা ‘আশুতোষ চক্রবর্ত্তী স্মারক শিক্ষাবৃত্তি’ চালু করেছি। সরাইলের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের এককালীন নগদ অর্থ ও মেডেল দেওয়ার এই অনুষ্ঠানটিতে যখন দেশের মাননীয় মন্ত্রী ও গুণীজনেরা প্রধান অতিথি হিসেবে আসেন, তখন গর্বে আমাদের বুক ভরে যায়। আমাদের মনে হয়, তুমি ওপর থেকে আমাদের দেখছ আর আশীবার্দ করছ।
বাবা তুমি খুশী হবে, বিগত ১৭ বছর ধরে তোমার প্রিয় সরাইলের বাড়ীটিতে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয় মহা ধুমধামে। উচালিয়াপাড়া সার্বজনীন দুর্গোৎসব ঐ অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে সুদৃঢ় করছে বারবার।
বাবা তোমার অবর্তমানে তোমার বড় মেয়ে আমাদের প্রাণপ্রিয় বড়দি প্রীতি চক্রবর্তী আজ দেশের একজন অত্যন্ত উঁচুমানের নারী উদ্যোক্তা। বড়দির স্নেহ ও শাসনে এবং মা’র স্নেহ ছায়াতলে আমরা সব ভাই-বোনরা তোমার স্বপ্ন পূরণে নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। আমার সন্তান ও তোমার আদরের নাতি দিব্যময় চক্রবর্তী (ঋজু) ১৮ বছরে পদার্পণ করেছে। ও এবার ‘ও’ লেভেল শেষ করে ‘এ’ লেভেলে। ওর মাঝে তোমার ছায়া দেখি। তাই ওকে আমি বাবা ডাকি। তোমার পুত্রবধূ নীতা চক্রবর্তীকে নিয়ে আমরা সুখে আছি বাবা। কিন্তু তোমার অভাব, তোমার জীবদ্দশায় কোন সাধ-আহ্লাদ পূর্ণ করতে না পারার বেদনা আমাকে অশ্রুসিক্ত করে।
তোমার অন্য মেয়েরা (স্মৃতি, সীমা, রাধা, কৃষ্ণা) রা স্বস্ব অবস্থানে সুখে শান্তিতে বসবাস করছে এবং প্রত্যেকের সন্তানেরা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে।
আমি বিশ্বাস করি আমরা ৭ ভাই-বোন (৬ বোন ১ ভাই) তোমার আদর্শে এদেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাব আজীবন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
বাবা, তুমি আমাদের শিখিয়েছ সততার চেয়ে বড় কোনো সম্পদ নেই। মা পুষ্প চক্রবর্ত্তীর কষ্ট আর তোমার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ঋণ আমরা কোনোদিন শোধ করতে পারব না। আজকের এই বিশেষ দিনে শুধু বলতে চাই—তুমি যে আলোর পথ আমাদের দেখিয়েছ, আমরা যেন আজীবন সেই পথেই চলতে পারি।
ওপারে ভালো থেকো বাবা। আমাদের হৃদয়ে তুমি থাকবে চিরকাল।
তোমার সন্তান,
ডাঃ আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা
ইউনিভার্সেল মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
Posted ১:৫৪ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
brahmanbaria2usa.com | Dulal Miah