কবীর আহমেদ ভূঁইয়া | শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | 15 বার পঠিত
প্রথম পর্ব:
যে গ্রামে আমার শৈশব রেখে এসেছি-
মানুষের জীবনে একটি অদ্ভুত নিয়ম আছে। বয়স যত বাড়ে, পথ তত সামনে এগিয়ে যায়; অথচ মন বারবার ফিরে যেতে চায় পেছনের সেই ফেলে আসা দিনগুলোর কাছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সবচেয়ে বেশি খোঁজে তার শৈশবকে। কারণ শৈশবই একমাত্র সময়, যেখানে ছিল না কোনো কৃত্রিমতা, ছিল না কোনো হিসাব-নিকাশ—ছিল শুধু নির্মল আনন্দ আর সীমাহীন ভালোবাসা।
আজও কোনো নীরব বিকেলে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়, আমার শৈশব যেন এখনো সেই গ্রামেই রয়ে গেছে। হয়তো সরিষার হলুদ ফুলের সমুদ্রে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকছে, হয়তো কোনো কাঁচা বাঁশের সাঁকোর ওপর বসে অপেক্ষা করছে, কিংবা বোয়ালিয়া বিল আর দক্ষিণ বিলের শান্ত জলের আয়নায় আজও আমার ছোট্ট ছায়াটি ভেসে বেড়ায়। সময় আমাকে অনেক দূরে নিয়ে এসেছে, কিন্তু আমার মন কখনোই সেই গ্রাম ছেড়ে আসতে পারেনি।
সেটা আশির দশকের কথা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বরিশলের সেই ছোট্ট গ্রামটি ছিল যেন পৃথিবীর কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন এক শান্ত স্বর্গ। বিদ্যুতের ঝলমলে আলো ছিল না, পাকা রাস্তার ব্যস্ততা ছিল না, আধুনিক সভ্যতার অহংকারও ছিল না। কিন্তু সেখানে যা ছিল, আজকের পৃথিবী তার মূল্য বুঝতে শিখেছে—বিশুদ্ধ বাতাস, গভীর মানবিকতা, আন্তরিক সম্পর্ক আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন।
ভোর হতো পাখির কূজন আর মোরগের ডাকে। পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফুটতেই শিশিরভেজা ঘাসের ওপর মুক্তার মতো জ্বলজ্বল করত অসংখ্য শিশিরবিন্দু। কুয়াশার সাদা চাদর ধীরে ধীরে সরিয়ে যখন সূর্যের আলো মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত, তখন মনে হতো, প্রকৃতি যেন নতুন করে পৃথিবীকে সাজিয়ে তুলেছে।
তখনও আমাদের এলাকায় ইরি ধানের চাষ শুরু হয়নি। ঋতুর পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মাঠের রূপও বদলে যেত। শীত এলে দিগন্তজোড়া সরিষার হলুদ ফুলে মাটিও যেন সোনালি রঙে রাঙিয়ে উঠত। কোথাও গমের শীষ বাতাসে দুলছে, কোথাও পাটগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও মাসকলাই, আসলি আর পরসুম ধানের ক্ষেত দিগন্ত ছুঁয়ে গেছে।
দূর থেকে তাকালে মনে হতো, মহান সৃষ্টিকর্তা যেন সবুজ ক্যানভাসের ওপর নিজের হাতে রঙের তুলি চালিয়ে এক অনিন্দ্যসুন্দর ছবি এঁকে রেখেছেন। সেই ছবির কোনো ফ্রেম ছিল না, কোনো সীমা ছিল না—শুধু ছিল বিস্তীর্ণ প্রকৃতি আর অফুরন্ত সৌন্দর্য।
বর্ষা ছিল আমাদের গ্রামের সবচেয়ে প্রাণবন্ত ঋতু।
আকাশভরা কালো মেঘ, টিপটিপ বৃষ্টি, ভেজা মাটির গন্ধ আর চারদিকে থইথই পানি—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম পৃথিবী। বর্ষা এলেই ধানের ক্ষেতে নেমে আসত টিয়া পাখির বিশাল ঝাঁক। দূর থেকে মনে হতো, সবুজ ধানের ওপর আবার যেন আরেক স্তর সবুজ বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কৃষকের চোখে তখন উৎকণ্ঠা। কারণ এই পাখিগুলো মুহূর্তেই পাকা ধানের অনেক ক্ষতি করত। কিন্তু আমাদের মতো শিশুদের কাছে সেটাই ছিল আনন্দের উৎসব। বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু দেখতাম—কী অপরূপ সেই দৃশ্য! মনে হতো, প্রকৃতি নিজেই যেন রঙিন এক মেলা বসিয়েছে।
গমের মৌসুমে আবার মাঠের চেহারা বদলে যেত। শালিক, কাক আর নানা জাতের পাখির আনাগোনায় কৃষকেরা ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। কেউ টিনের কৌটা বাজিয়ে পাখি তাড়াচ্ছেন, কেউ বাতাসে উড়ছে এমন কাপড় বেঁধে রাখছেন, কেউ জমির মাঝখানে কাকতাড়ুয়া বসাতেন, কেউ আবার উচ্চস্বরে ডাকছেন।
আজ ভাবি, তখন এসব ছিল জীবনের সাধারণ দৃশ্য। অথচ এখন বুঝি, সেগুলো ছিল বাংলার চিরায়ত কৃষিজীবনের একেকটি জীবন্ত অধ্যায়—যা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের স্রোতে।
আমার বড় ফুফা, আবু নাসের ভূঁইয়া, কাকা মাজু ভূঁইয়া, দুবরাজ ভূঁইয়া, ফিরোজ ভূইয়া, আব্দুল হাসিম ভূঁইয়া, ধন মিয়া ভূইয়াসহ অনেকেই ছিলেন এলাকার সম্মানিত গৃহস্থ। তাঁদের বিশাল গরুর পাল ছিল। পাশাপাশি ভেড়া আর ছাগলও পালন করতেন। তখন গবাদিপশু শুধু সম্পদ ছিলনা, ছিল পরিবারের সদস্যের মতোই প্রিয়।
ভোর হতেই রাখালরা লম্বা লাঠি কাঁধে নিয়ে গরুর পাল নিয়ে মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করতেন। গরুর গলায় বাঁধা ঘণ্টার টুংটাং শব্দ, রাখালের সুরেলা হাঁক আর ভোরের নির্মল বাতাস—আজও কানে বাজে।
আমাদের বাড়িতেও কয়েকটি গরু ছিল। কিন্তু আমাকে গরুর চেয়ে বেশি আকর্ষণ করত রাখালদের জীবন।
গরুগুলো মাঠে ছেড়ে দিয়ে তারা লাঠিখেলায় মেতে উঠত। কী অসাধারণ ছিল তাদের সেই দক্ষতা! বাতাস কেটে ঘুরতে থাকা লাঠির শব্দ শুনলে মনে হতো, যেন যুদ্ধের কোনো প্রাচীন কৌশল চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আমি গরুর দড়ি হাতে দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকতাম। মনে মনে স্বপ্ন দেখতাম—একদিন আমিও ওদের মতো লাঠি ঘোরাতে শিখব।
দক্ষিণ বিল আর গ্রামের পূর্ব দিকের বোয়ালিয়া বিল ছিল আমাদের গ্রামের হৃদস্পন্দন।
একদিকে গরুর পাল নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে, অন্যদিকে রাখালদের লাঠিখেলা, একটু দূরে জেলেরা জাল ফেলছে। কোথাও পানকৌড়ি ডুব দিচ্ছে, কোথাও সাদা বক এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে, আবার আকাশে বালি হাঁসের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে। ঢেউয়ের শব্দ, পাখির ডাক, মানুষের হাঁক—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন প্রতিদিন এক নতুন সিম্ফনি রচনা করত।
তখন বুঝিনি, এই দৃশ্যগুলোই একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠবে।
সরিষার ফুল ফুটলে মৌমাছিরা ঝাঁকে ঝাঁকে গ্রামে আসত। টিনের ঘরের চারপাশে ঘুরে বেড়াত। বাড়ির বড়রা টিনের চালে লাঠি দিয়ে টোকা দিতেন। সেই ধাতব শব্দ যেন তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ইঙ্গিত দিত। তারপর কোনো গাছের ডালে নতুন চাক গড়ে উঠত।
বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখতাম—হাজার হাজার মৌমাছি কী নিখুঁত নিয়মে নিজেদের নতুন সংসার গড়ে তুলছে। আজ মনে হয়, প্রকৃতিরও নিজস্ব এক ভাষা আছে, যা বোঝার জন্য বইয়ের বিদ্যা নয়, দরকার অনুভবের ক্ষমতা।
বিকেলের শেষ আলো পড়তেই গ্রামের মাঠ বদলে যেত শিশুদের রাজ্যে।
গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা, হাডুডু, ডাংগুলি—হাসির শব্দে মুখর হয়ে উঠত চারদিক। কেউ ফুটবল খেলছে, কেউ পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুবসাঁতার কাটছে। বাড়ির উঠোনে মেয়েরা বৌচি খেলছে, আর মায়েরা গল্প করতে করতে সংসারের ছোট ছোট কাজ সামলাচ্ছেন।
সন্ধ্যা নামলে দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসত আজানের সুমধুর ধ্বনি। মুহূর্তেই যেন পুরো গ্রাম শান্ত হয়ে যেত। গরুর পাল ফিরে আসত গোয়ালে, উঠোনে জ্বলে উঠত কুপির আলো, আর মায়ের স্নেহভরা ডাক শুনে বুঝতাম—আরেকটি আনন্দময় দিনের শেষ হলো।
আজ বহু বছর পেরিয়ে গেছে।
সেই মাঠের অনেকটাই হয়তো আর নেই। সরিষার ফুলের জায়গায় উঠেছে নতুন স্থাপনা। রাখালের লাঠিখেলা হারিয়ে গেছে, টিয়া পাখির ঝাঁকও আর আগের মতো নামে না। কিন্তু স্মৃতির ভেতরের গ্রামটিকে সময় ছুঁতে পারেনি।
সে আজও আগের মতোই সবুজ, আগের মতোই নির্মল, আগের মতোই ভালোবাসায় ভরা।
আমি জানি, এই স্মৃতিগুলো শুধু আমার নয়। আমার প্রজন্মের অসংখ্য মানুষের বুকের ভেতর এমনই একটি গ্রাম আজও নীরবে বেঁচে আছে। তাই এই কলম ধরা। হারিয়ে যাওয়া সেই সোনালি দিনগুলোর গল্প লিখে যেতে চাই, যাতে আগামী প্রজন্ম জানতে পারে—এক সময় বাংলার গ্রাম শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান ছিল না; ছিল মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, ভালোবাসার সবচেয়ে পবিত্র ঠিকানা, আর শৈশব নামের সবচেয়ে সুন্দর স্বর্গ।
লেখক : কবীর আহমেদ ভূঁইয়া
সদস্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপি
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান
ভূইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন
চলবে…
Posted ৯:০৩ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬
brahmanbaria2usa.com | Dulal Miah