বৃহস্পতিবার ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি, সব ক্লিনিকে লেবার রুম ও মিডওয়াইফ বাধ্যতামূলক: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

সঞ্জীব ভট্টাচার্য্য :   |   সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   74 বার পঠিত

অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি, সব ক্লিনিকে লেবার রুম ও মিডওয়াইফ বাধ্যতামূলক: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

দেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশনের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, কিছু বেসরকারি ক্লিনিক ও দালালচক্র গর্ভবতী নারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সিজারিয়ান করাতে উদ্বুদ্ধ করছে। এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।

সোমবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটি (বিএমএস) আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের একটি শ্রেণি অতিমাত্রায় মুনাফাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। মানুষের কল্যাণ বা দেশের স্বার্থের চেয়ে অর্থ উপার্জনই তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব স্বাস্থ্যসেবা খাতেও পড়ছে।

তিনি বলেন, একসময় দেশে অধিকাংশ সন্তান স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে জন্ম নিত এবং গ্রামাঞ্চলে অভিজ্ঞ দাইয়ের সহায়তায় নিরাপদ প্রসবের দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির পরও বর্তমানে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি, গর্ভাবস্থার শুরুতে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অনেক ক্ষেত্রে দালালচক্র ও কিছু চিকিৎসাকেন্দ্র পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন জটিলতার ভয় দেখিয়ে সিজারিয়ানের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। ‘অপারেশন না করলে মা কিংবা সন্তান বাঁচবে না’—এমন আশঙ্কা তৈরি করে পরিবারকে মানসিক চাপে ফেলা হয়। ফলে মা ও সন্তানের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অধিকাংশ পরিবার চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে নেয়।

তিনি বলেন, চিকিৎসকরা মানুষের কাছে আল্লাহর পর সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। তাই চিকিৎসা পেশায় নৈতিকতার চর্চা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর পুষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শিশুর জন্মের শুরু থেকেই সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। অপুষ্টি, অল্প বয়সে বিয়ে এবং মায়েদের দুর্বল স্বাস্থ্য শিশুদের নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের বিভিন্ন ওয়ার্ড পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক শিশুই চরম অপুষ্টিতে ভুগছে। একই সঙ্গে অনেক মায়ের শরীরেও পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব রয়েছে। ফলে নবজাতকের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষ মিডওয়াইফদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি এলাকায় মিডওয়াইফের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এটি শুধু কর্মসংস্থানের বিষয় নয়, বরং জাতির স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়।

তিনি জানান, চলতি বছর স্বাস্থ্যখাতে এক লাখ নতুন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার নারী নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তাদের বড় একটি অংশ মিডওয়াইফ হিসেবে কাজ করবেন, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া যায়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঘোষণা দেন, আগামী শনিবারের মধ্যে দেশের সব বেসরকারি ক্লিনিকে লেবার রুম স্থাপন করতে হবে। কোনো ক্লিনিক এ নির্দেশনা না মানলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে।

এ ছাড়া সব বেসরকারি ক্লিনিকে মিডওয়াইফ নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এতে গর্ভবতী নারীরা স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাবেন এবং স্বাভাবিক প্রসবে আরও উৎসাহিত হবেন।

তিনি বলেন, ভয়ভীতি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে মানুষকে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণে বাধ্য করার সংস্কৃতি থেকে দেশকে বেরিয়ে আসতে হবে। মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর স্বাস্থ্য নিশ্চিত না হলে একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

অনুষ্ঠানের শেষদিকে মিডওয়াইফদের সংগঠন গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের সংগঠন মাতৃস্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কর্মশালায় জানানো হয়, একজন ধাত্রী নিবন্ধন পাওয়ার আগে অন্তত ৪০টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন করেন। প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার ৮০০ দক্ষ ধাত্রী তৈরি হলেও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে তাদের বড় অংশ পেশা থেকে ঝরে পড়েন। প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে বছরে মাত্র প্রায় ৫০০ জন ধাত্রীর কাজের সুযোগ হয়, আর বাকিরা সাধারণ নার্স হিসেবে কাজ করেন। এতে প্রসবকালীন জটিলতা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

কর্মশালায় বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটির (বিএমএস) সভাপতি রোজিনা খাতুন, সাধারণ সম্পাদক হাসনা আখতার এবং বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার হালিমা আখতারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

Facebook Comments Box

Posted ৬:২৫ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

brahmanbaria2usa.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আরিফুর রহমান আরিফ

ARIFUR RAHMAN ARIF ( + 1 203-727-4273)

প্রধান সম্পাদক : হাকিকুল ইসলাম খোকন
সহসম্পাদক : মিম রহমান
নির্বাহী সম্পাদক : সঞ্জিব ভট্টাচার্য
আঞ্চলিক প্রতিনিধি, গাজীপুর অঞ্চল : আলহাজ্ব জায়দুল কবির ভাঙ্গী
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি : মিনহাজুল আবেদীন পলাশ
বার্তা সম্পাদক : মোহাম্মদ দুলাল মিয়া