শুক্রবার ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে শিশু আভানের মৃত্যু — চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ নাকচ করে ক্লিনিক্যাল সত্য তুলে ধরল ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

সঞ্জীব ভট্টাচার্য্য :   |   বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   62 বার পঠিত

ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে শিশু আভানের মৃত্যু — চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ নাকচ করে ক্লিনিক্যাল সত্য তুলে ধরল ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয়ে ৪ বছর বয়সী শিশু ওয়াইজ কুরুনী আভানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ ক্লিনিক্যাল টাইমলাইন ও চিকিৎসা বিবরণ তুলে ধরে একটি বিস্তারিত স্মারকলিপি প্রকাশ করেছে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাঃ আশীষ কুমার চক্রবর্তী স্বাক্ষরিত এই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একটি শিশুর অকাল মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং হাসপাতাল পরিবার এতে গভীরভাবে শোকাহত। কিন্তু এই দুঃখজনক ঘটনাকে পুঁজি করে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে জনরোষ উসকে দেওয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

হাসপাতালের বিবৃতি অনুযায়ী শিশুটির চিকিৎসার বিস্তারিত টাইমলাইন নিচে তুলে ধরা হলো।

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাতে ৪ বছর বয়সী শিশু আভান জ্বর ও নাক দিয়ে রক্তপাতসহ হেমোরেজিক ডেঙ্গু সন্দেহে হাসপাতালের বহিঃবিভাগে আসে। কর্তব্যরত সিনিয়র ডিউটি স্পেশালিস্ট ডাঃ নজরুল ইসলাম শিশুটিকে দেখে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা দেন এবং ঢাকা শিশু হাসপাতালের নবজাতক শিশু বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডাঃ মাহফুজা শিরীনের অধীনে ভর্তির পরামর্শ দেন। ভর্তির পর পরীক্ষায় ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন নিশ্চিত হওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা হয়।

২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রতিদিন বেশ কিছু পরীক্ষা করা হয়। ডেঙ্গু টেস্ট নেগেটিভ এলেও সিআরপি, ফেরিটিন, প্রোক্যালসিটোনিন, এসজিপিটি ও এসজিওটির রিপোর্ট ডেঙ্গু এক্সটেন্ডেড সিন্ড্রোমের সঙ্গে ক্লিনিক্যালি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। সেই অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা চলতে থাকে।

১ অক্টোবর ২০২৬ সন্ধ্যার পর থেকে শিশুটির ভাইটালস ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করে এবং সে দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রফেসর মাহফুজা শিরীন রোগী দেখে তাৎক্ষণিকভাবে পিআইসিইউতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু রোগীর মা পিআইসিইউতে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে বলেন যা চিকিৎসা দেওয়ার এখানেই দেন।

২ অক্টোবর ২০২৬ সকাল থেকে শিশুটির শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে এবং রক্তচাপ কমে যায়। ওয়ার্ডেই প্লাজমাসল ফ্লুইড শুরু করা হয়। দুপুর দেড়টায় প্রফেসর শিরীন আবারও রোগী দেখেন এবং দ্রুত পিআইসিইউতে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। এ সময়ও স্বজনরা স্থানান্তরে কালক্ষেপণ করেন। পরবর্তীতে স্বজনরা রাজি হওয়ায় বিকেল ৪টায় শিশুটিকে পিআইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। তখনই রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক সম্পর্কে মাকে অবহিত করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পিআইসিইউতে স্থানান্তরের পর প্রেশার বাড়াতে হার্টসল, প্লাজমাসল ইনফিউশন এবং ইনজেকশন ডোবুটামিন ও নর-অ্যাড্রিনালিন যোগ করা হয়।

৩ অক্টোবর ২০২৬ সকাল থেকে রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। ট্রোপোনিন-আই ও প্রো-বিএনপির রিপোর্ট বেশি থাকায় মায়োকার্ডাইটিসের পক্ষে ইনজেকশন আইভিআইজি ও মেথিলপ্রেডনিসোলোন দেওয়া হয়। প্রতিবারই লাইফ সাপোর্টের সম্ভাবনা সম্পর্কে মাকে অবহিত করে স্বাক্ষর রাখা হয়। বিকেল সাড়ে তিনটায় শ্বাস-প্রশ্বাসের অবনতি হওয়ায় লাইফ সাপোর্ট অর্থাৎ ভেন্টিলেটর দেওয়া হয় এবং সিভি লাইন করা হয়। এর পরেও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে সিপিআর দিয়ে হার্টবিট পুনরুদ্ধারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আভানকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বিকেল ৫টা ২ মিনিটে শিশুটি মৃত্যুবরণ করে। পরবর্তীতে মৃতদেহসহ সকল প্রিন্টেড রিপোর্ট ও ডেথ সার্টিফিকেট স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিআইসিইউ ও এনআইসিইউ দুজন স্বনামধন্য প্রফেসরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। তাঁরা হলেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের শিশু মেডিসিন বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডাঃ এম মনির হোসেন এবং নবজাতক শিশু বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডাঃ মাহফুজা শিরীন। তাঁদের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা শিশুরোগে এমডি ও এফসিপিএস ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, দক্ষ নার্স ও মেডিকেল অফিসার কর্মরত থাকেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে হাসপাতালে মব সৃষ্টির ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, যা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি চরম নিরাপত্তাহীনতা ও সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার ফলে চিকিৎসকদের মধ্যে ডিফেন্সিভ মেডিসিন চর্চা বাড়ছে, যার ফলে মুমূর্ষু রোগীদের জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে চিকিৎসকরা দ্বিধাগ্রস্ত হবেন এবং এর চূড়ান্ত ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষের।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাঃ আশীষ কুমার চক্রবর্তী বলেন, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশের সম্পূর্ণ চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। দেশের স্বাস্থ্যখাতকে সুরক্ষিত রাখতে এবং চিকিৎসা পরিবেশকে ভয়ভীতিমুক্ত রাখতে সংশ্লিষ্ট সকল নিয়ন্ত্রক সংস্থার তাৎক্ষণিক ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

Facebook Comments Box

Posted ৩:৪১ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

brahmanbaria2usa.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আরিফুর রহমান আরিফ

ARIFUR RAHMAN ARIF ( + 1 203-727-4273)

প্রধান সম্পাদক : হাকিকুল ইসলাম খোকন
সহসম্পাদক : মিম রহমান
নির্বাহী সম্পাদক : সঞ্জিব ভট্টাচার্য
আঞ্চলিক প্রতিনিধি, গাজীপুর অঞ্চল : আলহাজ্ব জায়দুল কবির ভাঙ্গী
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি : মিনহাজুল আবেদীন পলাশ
বার্তা সম্পাদক : মোহাম্মদ দুলাল মিয়া