সঞ্জীব ভট্টাচার্য্য : | রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | 96 বার পঠিত
রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল লিমিটেডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ বছর বয়সী শিশু ওয়াইজ কুরুনী আভানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে শিশুটির চিকিৎসা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে জানায়, যেকোনো শিশুর অকাল প্রয়াণ অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও অপূরণীয় ক্ষতি। শিশু আভানের মৃত্যুতে হাসপাতাল পরিবার গভীরভাবে ব্যথিত এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করছে। তবে চিকিৎসা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ও জনমনে সৃষ্ট বিভ্রান্তি নিরসনে প্রকৃত ঘটনা ও ক্লিনিক্যাল বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাতে শিশু আভান জ্বর, নাক দিয়ে রক্তপাত এবং হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বর সন্দেহে হাসপাতালের বহির্বিভাগে (ওপিডি) আসে। পিআইসিইউতে কর্তব্যরত সিনিয়র ডিউটি স্পেশালিস্ট ডা. নজরুল ইসলাম শিশুটিকে পরীক্ষা করেন এবং কিছু ইনভেস্টিগেশনের পাশাপাশি ঢাকা শিশু হাসপাতালের নবজাতক শিশু বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. মাহফুজা শিরীনের অধীনে ভর্তির পরামর্শ দেন। ভর্তির পরপর ইনভেস্টিগেশনে শিশুটির শরীরে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন নিশ্চিত হলে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা হয়। ভাইটালস ভালো থাকায় তাকে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
শিশু ওয়ার্ডে থাকাকালীন প্রতিদিন বেশ কিছু ইনভেস্টিগেশন করা হয়। এতে ডেঙ্গু টেস্ট নেগেটিভ আসলেও অন্যান্য প্যারামিটার ডেঙ্গু এক্সটেন্ডেড সিন্ড্রোমের সঙ্গে ক্লিনিক্যালি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ডেঙ্গু মহামারির এই মৌসুমে এ ধরনের রিপোর্ট স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যায়। সেই অনুযায়ীই ট্রিটমেন্ট প্ল্যান চলতে থাকে।
০১ অক্টোবর ২০২৬ সন্ধ্যার পর থেকে রোগীর ভাইটালস ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে। প্রফেসর ডা. মাহফুজা শিরীন রোগী দেখতে এলে রোগীর মা জানান, বাচ্চা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। প্রফেসর শিরীন তাৎক্ষণিকভাবে ভাইটালস দেখে ক্লোজ মনিটরিংয়ের জন্য শিশুটিকে পিআইসিইউতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু রোগীর মা পিআইসিইউতে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘যা চিকিৎসা দেওয়ার এখানেই দেন।’ অতঃপর প্রফেসর শিরীন আরও কিছু পরীক্ষা পাঠানোসহ শিশু ওয়ার্ডে যতটুকু সম্ভব সেখানেই চিকিৎসা প্রদান করার জন্য বলেন।
০২ অক্টোবর সকাল থেকে বাচ্চার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে; বিশেষ করে প্রেশার কমে যাওয়ায় ওয়ার্ডেই প্রেশার বাড়ানোর জন্য প্লাজমাসল ফ্লুইড শুরু করা হয়। দুপুর দেড়টায় প্রফেসর ডা. মাহফুজা শিরীন আবারও রোগী দেখেন। এই চিকিৎসা চলা সত্ত্বেও রোগীর অবস্থার অবনতি হওয়ায় তিনি আবারও দ্রুত পিআইসিইউতে শিফট করতে বলেন। কিন্তু তখনো রোগীর স্বজনরা পিআইসিইউতে শিফট করতে কালক্ষেপণ করেন। পরবর্তীতে স্বজনরা রাজি হওয়ায় বিকাল ৪টায় রোগীকে পিআইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
পিআইসিইউতে স্থানান্তরের পর প্রেশার বাড়ানোর জন্য হার্টসল, প্লাজমাসল ইনফিউশন, ইনজেকশন ডোবিউটামিন ও ইনজেকশন নর-অ্যাড্রেনালিন যোগ করা হয়। অন্যান্য চিকিৎসা একসঙ্গে চলতে থাকে। কিন্তু রোগীর অবস্থা অপরিবর্তিত থেকে আরও আশঙ্কাজনক হতে থাকে। ০৩ অক্টোবর সকাল থেকে রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। প্রথম থেকেই রোগীর মায়ের সঙ্গে কথা বলা হয় এবং বাচ্চার ক্রমাবনতির কথা জানিয়ে যেকোনো সময় লাইফ সাপোর্ট লাগতে পারে সে বিষয়েও অবহিত করা হয়। প্রতিবারই বাচ্চার মায়ের কাছ থেকে অবহিতকরণ স্বাক্ষর রাখা হয়। এ সময় মায়োকার্ডাইটিসের পক্ষে ট্রপোনিন-১ ও প্রো-বিএনপি-এর রিপোর্ট বেশি থাকায় ইনজেকশন আইভিআইজি ও ইনজেকশন মিথাইলপ্রেডনিসোলন দেওয়া হয়।
০৩ অক্টোবর বিকাল সাড়ে তিনটায় বাচ্চার শ্বাস-প্রশ্বাসের অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্ট (ভেন্টিলেটর) দেওয়া হয় এবং পাশাপাশি সিভি লাইন করা হয়। কিন্তু সকল জীবনরক্ষাকারী ওষুধ চালানোর পরেও রোগীর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় এবং সিপিআর দিয়ে হার্টবিট পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আভানকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বিকাল ৫টা ২ মিনিটে শিশুটি মৃত্যুবরণ করে। পরবর্তীতে মৃতদেহসহ আভানের সকল প্রিন্টেড ইনভেস্টিগেশনের কপি ও ডেথ সার্টিফিকেট রোগীর স্বজনদের প্রদান করা হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দীর্ঘদিন যাবত এনআইসিইউ ও পিআইসিইউতে অসংখ্য বাচ্চাকে সফলভাবে চিকিৎসা দিয়ে আসছে। এই পিআইসিইউ ও এনআইসিইউ দুইজন স্বনামধন্য প্রফেসরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছে। তাদের সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা শিশুরোগে এমডি ও এফসিপিএস ডিগ্রিধারী স্পেশালিস্ট ডাক্তার রয়েছেন। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা দক্ষ নার্স, মেডিকেল অফিসার ও শিশু বিশেষজ্ঞ রেজিস্ট্রার বিদ্যমান থাকেন।
হাসপাতাল কখনোই একটি শিশুর মৃত্যু চায় না এবং এখানে প্রতিনিয়ত ইন্টারন্যাশনাল ও ন্যাশনাল গাইডলাইন অনুসরণ করেই চিকিৎসা প্রদান করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকমণ্ডলী শুরু থেকেই রোগীর জীবন রক্ষায় সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, আন্তরিকতা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক প্রোটোকল অনুসরণ করেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পরিবারের পক্ষ থেকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) স্থানান্তরে অনিচ্ছা ও কালক্ষেপণ চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছিল।
চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিবেদিত প্রচেষ্টাকে পাশ কাটিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খণ্ডিত, অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য ছড়িয়ে হাসপাতালের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার যেকোনো অপতৎপরতা অনভিপ্রেত ও সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। প্রকৃত সত্য যাচাই না করে কোনো প্রকার অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সর্বসাধারণ ও সম্মানিত শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছি।
Posted ৫:৪৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬
brahmanbaria2usa.com | Dulal Miah