সঞ্জীব ভট্টাচার্য্য : | শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | 56 বার পঠিত
বাবা ও ছোট ভাইকে ক্যানসারে হারিয়েছেন। অর্থাভাবে থেমে গেছে পড়াশোনা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে সামলাতে হচ্ছে অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা ও নিজের সংসার। স্ত্রীও সন্তানসম্ভবা। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ভিক্ষা করতে চান না ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার আরিফ। ছোট্ট একটি দোকানে মোবাইলের সরঞ্জাম বিক্রি ও মানুষের ওজন মেপে যা আয় করেন, তা দিয়েই চলে সংসার। এখন সামান্য পুঁজি পেলে ব্যবসা বড় করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
আরিফ কসবা পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামের হানিফ মিয়ার ছেলে। দুই ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছোট। কসবা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও পারিবারিক শোক ও আর্থিক সংকটে শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি।
ছোট ভাইয়ের মৃত্যু এবং ২০২৪ সালে বাবাকে হারানোর শোক তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে। একই সঙ্গে পরিবারের দায়িত্বও এসে পড়ে তার কাঁধে। কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে জীবিকার জন্য বেছে নেন ক্ষুদ্র ব্যবসা।
ছোট্ট দোকানেই পরিবারের ভরসা
২০২০ সালে একটি ছোট ওজন মাপার যন্ত্র দিয়ে উপার্জন শুরু করেন আরিফ। পরে কসবা বাজারে ছোট একটি স্টলে মোবাইলের কাভার, হেডফোন, মানিব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি শুরু করেন। পাশাপাশি পথচারীদের ওজন মেপেও কিছু টাকা আয় করেন।
তবে পণ্যের চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত পুঁজির অভাবে প্রয়োজনীয় মালামাল কিনতে পারেন না তিনি। ফলে বাড়ছে না বিক্রি, বড় হচ্ছে না ব্যবসাও। সামান্য আয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা করতে হচ্ছে তাকে। এর মধ্যে স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হওয়ায় অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও বাড়ছে দুশ্চিন্তা।
‘ভিক্ষা ছাড়া আর কী করতে পারবা’—তবু থামেননি আরিফ
আরিফের কাছে দোকানটি শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়, আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন। অনেকেই তাকে ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘ভিক্ষা ছাড়া আর কী করতে পারবা?’ কিন্তু এসব কথায় দমে যাননি তিনি। নিজের শ্রমে উপার্জন করে পরিবার চালানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কসবা বাজারের ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরাও তার এই সংগ্রামের কথা জানেন। তারা আরিফের পরিশ্রম ও আত্মমর্যাদাবোধের প্রশংসা করেছেন। পাশাপাশি তার ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
ক্রেতা ফয়েজুর রহমান বলেন, ‘আমি আরিফের কাছ থেকে একটি মানিব্যাগ কিনেছি। ফুটপাতে এরকম ভালো জিনিস সচরাচর পাওয়া যায় না। জিনিস খুব ভালো। আরিফ এখানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছে। আমরা চাই, সরকারিভাবে যেন তাকে সহায়তা দেওয়া হয়।’
আরেক ক্রেতা সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বলেন, ‘তার বাবা নেই, মা আছেন। সঙ্গে তার পরিবারও আছে। সে ইচ্ছা করলেই মানুষের কাছে হাত পাততে পারতেন, কিন্তু সেটা না করে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।’
আরিফের দীর্ঘদিনের এক সহকর্মী ব্যবসায়ী জানান, প্রায় ছয় বছর ধরে তিনি আরিফের সঙ্গে ব্যবসা করছেন। আরিফ মোটামুটি শিক্ষিত। সরকার তার জন্য কোনো চাকরির ব্যবস্থা করলে তিনি কাজ করে পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পার্শ্ববর্তী ব্যবসায়ী মো. হানিফ মিয়া বলেন, ‘আরিফ একজন প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী হয়েও সে নিজের শ্রমের বিনিময়ে হালালভাবে উপার্জন করে যাচ্ছে। সরকার তাকে সহায়তা করলে ব্যবসাটাকে আরেকটু উন্নত করতে পারত।’
সামান্য পুঁজিই বদলে দিতে পারে জীবন
নিজের সংগ্রামের কথা জানিয়ে আরিফ বলেন, ‘আমি কসবা বাজারে ২০২০ সাল থেকে ব্যবসা করে আসছি। প্রথমে ছোট্ট একটি ওজন মাপার মেশিন দিয়ে শুরু করি। পরে পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য ছোট্ট একটি স্টলে ব্যবসা শুরু করি। আমার পরিবার দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত। তাই সামান্য পুঁজি দিয়ে ব্যবসাটি শুরু করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘পণ্যের চাহিদা থাকলেও নানা আর্থিক সংকটের কারণে ব্যবসাটি সেভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই সহযোগিতা করেছেন, তবে সরকারিভাবে এখনো কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমি সরকার ও সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের কাছে আবেদন করছি, আমার এই ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার জন্য সামান্য কিছু হলেও অনুদান দিন। আমার মা অসুস্থ এবং স্ত্রীও সন্তানসম্ভবা।’
আরিফ জানান, ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা করার প্রবল ইচ্ছা ছিল তার। কসবা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু আর্থিক সংকট এবং ছোট ভাইয়ের মৃত্যুতে মানসিক চাপ বেড়ে যায়। পরে ২০২৪ সালে বাবাও ক্যানসারে মারা যান। শোক ও আর্থিক অনটনের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি তিনি।
ভিক্ষা না করার বিষয়ে আরিফ বলেন, ‘আমি আমার পরিবারের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। অনেকেই ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ভিক্ষা ছাড়া তুমি আর কী করতে পারবা? তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি হালালভাবে ব্যবসা করে, পরিশ্রম করে আয় করার।’
সহায়তা পেলে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা
আরিফের চাওয়া খুব বেশি নয়। প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে বিক্রি বাড়ানো, ছোট্ট দোকানটি বড় করা এবং পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে চান তিনি। সামান্য পুঁজি কিংবা সরকারি সহায়তা পেলে ব্যবসার পাশাপাশি অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালানো সহজ হবে বলে আশা করছেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আরিফের মতো পরিশ্রমী মানুষ যেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক সংকটের কারণে পিছিয়ে না পড়েন। তার যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা করা গেলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন তিনি।
কসবা উপজেলা মার্কেটের পশ্চিম কোণে ছোট্ট একটি দোকানে প্রতিদিন লড়াই করে যাচ্ছেন আরিফ। প্রিয়জন হারানোর শোক, থেমে যাওয়া পড়াশোনা কিংবা অভাব—কোনোটিই তাকে পরিশ্রমের পথ থেকে সরাতে পারেনি। মানুষের কাছে হাত পেতে নয়, নিজের শ্রমে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চান তিনি। তার এই লড়াইয়ে এখন প্রয়োজন সামান্য পুঁজি, কর্মসংস্থানের সুযোগ ও মানবিক সহযোগিতা।
Posted ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
brahmanbaria2usa.com | Dulal Miah