সোমবার ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সজীব সিংহ: ব্যাংক খেলাপি থেকে ধর্মীয় তহবিল আত্মসাৎ—আওয়ামী দোসর এখন বিএনপি সেজে বেড়াচ্ছেন

বিশেষ প্রতিনিধি :   |   শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   58 বার পঠিত

সজীব সিংহ: ব্যাংক খেলাপি থেকে ধর্মীয় তহবিল আত্মসাৎ—আওয়ামী দোসর এখন বিএনপি সেজে বেড়াচ্ছেন

ব্যবসায়ী, মেঘনা ব্যাংকের উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার এবং চট্টগ্রাম জেলা সৎসঙ্গের সিনিয়র সহ-সভাপতি সজীব সিংহ রুবেল ওরফে সজীব সিংহ সম্প্রতি নানা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাংক ঋণ খেলাপি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তহবিল আত্মসাৎ, ব্যবসায়ীদের টাকা হাতিয়ে নেওয়া, অবৈধ উপায়ে ভবন নির্মাণ এবং ভাড়াটিয়াদের নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা—তিনি আগে আওয়ামী লীগের অনুগত কর্মী হলেও এখন নিজেকে বিএনপি সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো পূবালী ব্যাংক লিমিটেডের বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ। সজীব সিংহের মালিকানাধীন খাতুনগঞ্জের নবী সুপার মার্কেটের অনুকূল ট্রেডার্স পূবালী ব্যাংকের সিডিএ করপোরেট শাখা থেকে ঋণ নিয়ে নিয়মিত পরিশোধে ব্যর্থ হয়। ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, তাঁর কাছে মোট খেলাপি পাওনা ২২ কোটি ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার ২৫৫ টাকা। এই টাকা আদায়ে ব্যাংক বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে।

ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, “শহরে তার বেশ কয়েকটি বিল্ডিং আছে যা ভাড়া দিয়ে রেখেছেন, কিন্তু তিনি ইচ্ছা করেই টাকা দিচ্ছেন না। ব্যবসার নামে ঋণ নিয়ে তিনি মেঘনা ব্যাংকের পরিচালক হয়েছেন, যা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।”

জবাবে সজীব সিংহ দাবি করেন, তিনি ঋণ পরিশোধে আগ্রহী এবং সুদ মওকুফের শর্তে পুনঃতফসিল চেয়েছেন। তবে ব্যাংক বলছে, বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও তিনি কোনো উদ্যোগ নেননি।

‘কদবেলের আত্মকাহিনী’: আশ্রমের টাকা দিয়ে নিজের বাড়ি, আত্মীয়ের চাকরি
চট্টগ্রাম জেলা সৎসঙ্গের সাধারণ ভক্তদের লেখা ‘একজন কদবেলের আত্ম কাহিনী’ শিরোনামের একটি পত্রে সজীব সিংহের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বলা হয়েছে, তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তহবিল ব্যবহার করে নিজের ‘ঠাকুরের বড় বাড়ি’ নির্মাণ করছেন, আশ্রমের এক লক্ষ ইট নিজের কাজে লাগিয়েছেন এবং ফান্ডের টাকা দিয়ে আত্মীয়ের চাকরি স্থায়ী করেছেন।

পত্রটিতে উল্লেখ, “আশ্রমের ইট ক্রয় বাবদ ৭.৫ লক্ষ টাকা আত্মসাতের পায়তারা করছেন” এবং “মেঘনা ব্যাংকের নোয়াপাড়া শাখায় ফিক্সড ডিপোজিট করে ভাগীনার চাকরি স্থায়ী করা হয়েছে—যার বিষয়ে সভাপতি বা সম্পাদক কিছু জানেন না।” অভিযোগে আরও বলা হয়, তিনি নিজের পকেট থেকে এক টাকাও খরচ না করে আশ্রমের অর্থ দিয়ে সব বিল মেটান।

ব্যবসায়ীদের টাকা আত্মসাৎ, শ্রমিকদের বেতন বাকি
ব্যবসায়িক মহলেও সজীব সিংহের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। অনেকে বলছেন, তিনি জোরপূর্বক অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং লেনদেন খারাপ হওয়ায় এখন আর কেউ তাঁর সাথে সম্পর্ক রাখতে চান না। শ্রমিকদের বেতন না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে—যার ফলে কোনো শ্রমিক তার মালামাল টানতে রাজি নন।

অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি একাধিক বহুতল ভবন করেছেন বলেও জানা গেছে। পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তার বক্তব্যেও এর প্রতিফলন আছে।

ভাড়াটিয়াদের ২-৩ মাসের টাকা নিয়ে নির্যাতন
সজীব সিংহ তাঁর নিজস্ব ভবনগুলোর ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে দুই-তিন মাসের ভাড়া নিয়ে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ ও নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত। তাঁর ‘বাহিনী’ বলে পরিচিত একটি গ্রুপ ভাড়াটিয়াদের হয়রানি করে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

আওয়ামী দোসর থেকে বিএনপি সেজে নতুন পরিচয়
সর্বশেষ যে তথ্যটি সামনে এসেছে, তা হলো সজীব সিংহ আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন—যাকে এলাকার মানুষ ‘১ নং বাটপার’ বলেই চিনতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এখন নিজেকে বিএনপি সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি দল বদলে নতুন করে নিজের ইমেজ তৈরি করতে চাইছেন, যদিও তাঁর পুরোনো আওয়ামী দোসর হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা অনেকের কাছেই জানা।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলায় আসামি
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলায় সজীব সিংহ রুবেল নামে তাকে ১২৪ নম্বর আসামি করা হয়েছে। ওই মামলায় তিনি ও অন্যান্য আসামিরা নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও গুলি চালানোর সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত।

মেঘনা ব্যাংকের প্রতিবাদ:
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ৩১ আগস্ট দৈনিক শেয়ার বিজ-এ ‘পূবালী ব্যাংকে খেলাপি মেঘনা ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক!’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হলে মেঘনা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রতিবাদ জানায়। তারা বলে, সজীব কুমার সিংহ ব্যাংকের পরিচালক নন, তিনি কেবল উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার এবং সংবাদটি অসত্য।

তবে একাধিক আর্থিক অনিয়ম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ, ব্যবসায়িক প্রতারণা এবং রাজনৈতিক দল বদলের অভিযোগে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও সামাজিক মহলে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

Facebook Comments Box

Posted ১১:৫৬ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

brahmanbaria2usa.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আরিফুর রহমান আরিফ

ARIFUR RAHMAN ARIF ( + 1 203-727-4273)

প্রধান সম্পাদক : হাকিকুল ইসলাম খোকন
সহসম্পাদক : মিম রহমান
নির্বাহী সম্পাদক : সঞ্জিব ভট্টাচার্য
আঞ্চলিক প্রতিনিধি, গাজীপুর অঞ্চল : আলহাজ্ব জায়দুল কবির ভাঙ্গী
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি : মিনহাজুল আবেদীন পলাশ
বার্তা সম্পাদক : মোহাম্মদ দুলাল মিয়া