আরিফুর রহমান আরিফ | সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | প্রিন্ট | 240 বার পঠিত
বাংলাদেশে এখনো বেকার তরুণ ও যুবকের সংখ্যা অনেক। আর এটিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায় দেশি-বিদেশি মানবপাচারকারী চক্র। তারা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিবছর শত শত তরুণ-যুবকের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। হাতিয়ে নেয় বিপুল পরিমাণ অর্থ।
পাচারের শিকার ব্যক্তিদের বিদেশে গিয়ে যৌন নিপীড়ন, দাসত্ব বরণসহ নানা রকম অমানবিক পেশায় নিয়োজিত হতে হচ্ছে। অনেকের মৃত্যুও হয়। আবার অনেককে জিম্মি বানিয়ে তাদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করার ঘটনাও ঘটে।
কিছুটা উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় প্রতিবছর যে শত শত তরুণ অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি জমান, তাঁদের কেউ কেউ প্রচণ্ড দুর্ভোগ মোকাবেলা করে শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছতে পারলেও অনেকেই তা পারেন না। অনেককেই অত্যন্ত করুণ পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়।
২৩ ফেব্রুয়ারি রবিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মো. রাসেল মিয়া। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার ধরমণ্ডল ইউনিয়নের স্বপ্নচারী যুবক। জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সন্ধানে পৈত্রিক ভিটা বিক্রি করে ছুটেছিলেন অজানা গন্তব্যে। পরিবারকে স্বচ্ছলতার আলো দেখানোর স্বপ্ন নিয়ে ২০২৪ সালে পাড়ি জামান লিবিয়ায়। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝে যে এক নিষ্ঠুর ফাঁদ অপেক্ষা করছিল, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। অবশেষে মাফিয়া চক্রের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে নিভে গেল আরও এক তরুণ প্রাণ। রাসেল উপজেলার ধরমণ্ডল ইউনিয়নের ধরমণ্ডল গ্রামের লাওস মিয়া আউলিয়া বেগম দম্পতির বড় ছেলে।
২০২৪ সালের প্রথম দিকে, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে পরিবারের শেষ সম্বল পৈত্রিক ভিটা বিক্রি করে ১৫ লাখ টাকা তুলে দেন একই গ্রামের মানব পাচারকারী লিলু মিয়ার হাতে। কথা ছিল লিবিয়া থেকে ইতালি পাঠানো হবে। কিন্তু বিদেশের মাটিতে পৌঁছে তার কপালে জোটে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। সেখানে গিয়ে তাকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয় লিবিয়ার একটি স্থানীয় দালাল চক্রের হাতে। এর পরই শুরু হয় দুঃস্বপ্নের অধ্যায়। মাফিয়া চক্র রাসেলকে নির্যাতন করে একাধিকবার ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন ৩০ লাখ টাকা। সবশেষ আরো ১০ লাখ টাকা দাবি করে চক্রটি। কিন্তু টাকা না দেওয়ায় ইনজেকশন প্রয়োগ করে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগী পরিবারের।
বাংলাদেশ থেকে মানবপাচার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে গেছে। বেড়েছে করুণ মৃত্যুর ঘটনাও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত বছর মানবপাচার মোকাবেলা বিষয়ক ২০২৪ সালের যে বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের কোনো উন্নতি হয়নি।
নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও ন্যূনতম মান অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ। সম্প্রতি ফেরত আসার পর বিমানবন্দরে পাচারের শিকার ব্যক্তিরা বলেছেন, লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে মানবপাচার চক্রের সদস্যরা তাঁদের জিম্মি করে নির্যাতন করেছে। নির্যাতিত ব্যক্তিদের দিয়ে বাংলাদেশে স্বজনদের কাছে মুক্তিপণের টাকা দাবি করে। দেশ থেকে টাকা পাঠানোর পর তাঁদের ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পাঠানোর জন্য বোটে তুলে দেয়। সাগরে বোট নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর তিউনিশিয়ার কোস্ট গার্ড তাঁদের উদ্ধার করে। এরপর তাঁদের আলজেরিয়া সীমান্তে নিয়ে গেলে তাঁরা সেখানে অনুপ্রবেশের দায়ে নানা মেয়াদে জেল খাটেন।
দীর্ঘকাল ধরেই বিদেশ গমনেচ্ছু সাধারণ মানুষ প্রতারকদের দ্বারা হয়রানির শিকার হচ্ছে। মিথ্যা আশ্বাস, প্রলোভন, বৈধভাবে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে অবৈধভাবে বিদেশে পাঠানোর ঘটনা ঘটছে। মিথ্যা আশ্বাসে অসংখ্য মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে, বিপদে পড়ছে। সারা দেশে পাচারকারীদের বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। তারা বেকার যুবকদের টার্গেট করে নানা ধরনের মিথ্যা প্রলোভন দিতে থাকে। একসময় বহু তরুণ তাদের পাতা ফাঁদে পা দেন। সাধারণত ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দিয়েই লিবিয়ায় নেওয়া হয়।
বাংলাদেশে মানবপাচারের মতো একটি ভয়াবহ অপরাধ রোধে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে অপরাধীদের দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা চাই, বাংলাদেশ থেকে মানবপাচার দ্রুত নির্মূল হোক।
Posted ৩:২২ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
brahmanbaria2usa.com | Dulal Miah