সোমবার ৩রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

♦ আরো দুটি পণ্য জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ♦ পণ্য দুটি হলো মধুপুরের আনারস ♦ পণ্য দুটি হলো ভোলার মহিষের দুধের কাঁচা দই

জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টি

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪   |   প্রিন্ট   |   145 বার পঠিত

জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টি

জিওগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিফিকেশন (জিআই) বা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টি।
গত মঙ্গলবার পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টিকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একই দিনে এর সঙ্গে আরো দুটি পণ্য জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অন্য দুটি পণ্য হলো মধুপুরের আনারস ও ভোলার মহিষের দুধের কাঁচা দই।

বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মুনিম হাসান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টিকে গত ৮ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ ও ৩০ নম্বর শ্রেণিতে পণ্যটি জিআই-৭৫ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টি জিআই সনদপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে পণ্যটির স্বীকৃতি মিলেছে।

এই স্বীকৃতির ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টি আন্তর্জাতিকভাবে ভাবমূর্তি বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এতে গুণগত পরিবর্তন ও বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।

ভোজন রসিক হিসেবে আদিকাল থেকেই বাঙ্গালীর খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। তার ওপর খাবারের মেন্য্যুতে যদি থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী? তাহলে তো সোনায় সোহাগা।

প্রায় একশ’ বছর আগে লোভনীয় খাবারের তালিকায় এই নামটি যোগ করেছিলেন মহাদেব পাঁড়ে। তার পর থেকে দীর্ঘ সময় একই জনপ্রিয়তা পেয়েছে খাবারটি। ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন ‘ছানামুখী’-এর সুখ্যাতি বৃটিশ রাজত্বকাল হতে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। বৃটিশ কর্মকর্তা থেকে আমজনতা সবাই তৃপ্ত এর স্বাদে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এখনো পছন্দের খাবারের তালিকায় প্রথম সারিতে আসে ছানামুখীর নাম।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যেসব খাবার বিখ্যাত, তার একটি ছানামুখী। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিষ্টির সুনামের পেছনে যে ব্যক্তির নাম জড়িত তিনি হলেন মহাদেব পাঁড়ে। তাঁর জন্ম স্থান কাশীধামে। তাঁর বড় ভাই দুর্গা প্রসাদ কিশোর মহাদেবকে নিয়ে কলকাতায় আসেন। বড় ভাই এর মিষ্টির দোকানে মিষ্টি তৈরী শুরু করেন বালক মহাদেব। কিন্তু অসময়ে বড় ভাই দুর্গা প্রসাদ পরলোক গমন করেন। নিরাশ্রয় হয়ে মহাদেব বেড়িয়ে পড়েন নিরুদ্দেশে। অবশেষে এলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে। শতাধিক বছর পূর্বে তখন শহরের মেড্ডার শিবরাম মোদকের একটি মিষ্টির দোকান ছিল। তিনি মহাদেবকে আশ্রয় দিলেন। মহাদেব আসার পর শিবরামের মিষ্টির সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। মৃত্যুর সময় শিবরাম তাঁর মিষ্টির দোকানটি মহাদেবকে দিয়ে যান।

বাইরে থেকে শুকনো। কামড় বসালেই ভেতরের হালকা রস মুখে আনে তৃপ্তি। ছানামুখী তৈরিতে ব্যবহার হয় দুধের ছানা, চিনি, তেজপাতা, এলাচ, আইসিং সুগার। সাধারণত ছয় কেজি ছানামুখী তৈরি করতে সাধারণত ৪০ লিটার দুধ প্রয়োজন। দুধের ছানা তৈরি করে তা থেকে অতিরিক্ত পানি ঝরাতে হয়। এরপর শুকনো ছানাকে দুই থেকে তিন ঘণ্টা রাখতে হয় ফ্রিজে। এতে ছানা শক্ত হয়ে যায়। শক্ত ছানাকে ছোট ছোট চার কোনা আকারে কেটে নেয়া হয়। চাইলে গোল বা ইচ্ছে মতো অন্য আকারও দেয়া যেতে পারে।

এরপর একটি প্যানে চিনি, পানি ও এলাচ দিয়ে মাঝারি আঁচে চুলায় দিয়ে ফুটিয়ে সিরা তৈরি করে নিতে হবে। সিরা সঠিক ভাবে ঘন হয়ে এলে চুলার আঁচ কমিয়ে দিতে হবে। এবার ছানার টুকরোগুলো ছেড়ে দিতে হবে সিরাতে। চার-পাঁচ মিনিট আস্তে আস্তে নাড়ার পর যখন ছানাগুলো উপরে ভেসে উঠলে তা নামিয়ে নিতে হবে। এরপর আইসিং সুগারের ওপর গড়িয়ে রেখে দিতে হবে। ঠাণ্ডা হলে খেতে হবে অথবা পরিবেশন করতে হবে।

এক সময় দেখা যাবে, ছানার গায়ে চিনি সুন্দরভাবে লেগে গেছে। ভাল করে জ্বাল দেয়ার কারণে ছানার ভেতরে কিছুটা রস ঢুকে গেছে। বাইরে চিনির রস শুকিয়ে লেগে থাকলেও ভেতরের অংশ খানিকটা ভেজাই থাকবে।

ছানার তৈরি মিষ্টিটি চার কোনা, ক্ষুদ্রাকার ও শক্ত। এর ওপর জমাটবাঁধা চিনির প্রলেপ থাকে। খেতে খুবই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। প্রতি কেজি ছানামুখী বিক্রি হয় ৪০০ থেকে ৪২০ টাকায়।

ছানামুখীর জন্য সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হচ্ছে শহরের ভোলাগিরি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, ভোলানাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, আনন্দময়ী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, আদর্শ মাতৃ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার।

ভোলার দুই শ বছরের ঐতিহ্যবাহী মহিষের দুধের কাঁচা দইকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির জন্য গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর ভোলার জেলা প্রশাসক পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ নম্বর শ্রেণিতে পণ্যটি জিআই-৫৫ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। মহিষের দুধের কাঁচা দই জিআই সনদপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে পণ্যটির স্বীকৃতি মিলেছে।
সাগর আর নদীবেষ্টিত দ্বীপ জেলা ভোলার মানুষের জীবনমানে রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। খাবারেও রয়েছে নিজস্বতা। এরই অংশ হিসেবে এ জেলা দীর্ঘকাল ধরে পরিচিতি পেয়েছে মহিষের দুধের কাঁচা টক দই, যা স্থানীয়ভাবে ‘মইষা দই’ নামে পরিচিত। ভোলা জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি মোবাশ্বির উল্লাহ চৌধুরী জানান, বিষয়টি ভোলাবাসীর জন্য আনন্দের।
এ স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে ভোলায় মহিষ পালনকারী ও দই উৎপাদনকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ভোলার জেলা প্রশাসক মো. আজাদ জাহান বলেন, ‘ভোলার মহিষের দুধের কাঁচা দইয়ের যে স্বীকৃতি সেটি অন্য জেলায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ভোলার মহিষের দুধের কাঁচা দই ভোলার ঐতিহ্য। এটি অন্য জেলার হতে পারে না। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয়রা অনেক চেষ্টা করে এটি ফিরে পেয়েছে।

জিআই-৫৫ নম্বরে এটি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ। ভোলাবাসী এটি নিয়ে গর্বিত। এর মাধ্যমে এটির বৈশ্বিক স্বীকৃতি মিলেছে। জিআই হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় প্রথমত এই পণ্যটি ভোলার বলে চিহ্নিত হলো। দ্বিতীয়ত, এই স্বীকৃতির মাধ্যমে পণ্যটির বাণিজ্যিকীকরণের সুবিধা বাড়ল। এই দধি এখন দেশের বাইরেও রপ্তানি করা যাবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে দধি উৎপাদনে মানের উন্নতি হবে। কেননা জিআই স্বীকৃতি পণ্যের মান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।’

পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মুনিম হাসান বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভোলার মহিষের দুধের কাঁচা দধিসহ তিনটি পণ্যকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তর থেকে এসংক্রান্ত তিনটি সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। একটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী মিষ্টি, বাকি দুটি পণ্য হলো মধুপুরের আনারস ও ভোলার মহিষের দুধের কাঁচা দই। আরো বেশ কয়েকটি পণ্যকে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও তারা এখনো সার্টিফিকের ফি জমা না দেওয়ায় তাদের সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়নি। সেগুলো খুব দ্রুত হয়ে যাবে।’

Facebook Comments Box

Posted ৩:১০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪

brahmanbaria2usa.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক ও প্রকাশক : আরিফুর রহমান আরিফ

ARIFUR RAHMAN ARIF ( + 1 203-727-4273)

প্রধান সম্পাদক : হাকিকুল ইসলাম খোকন
সহসম্পাদক : মিম রহমান
নির্বাহী সম্পাদক : সঞ্জিব ভট্টাচার্য
আঞ্চলিক প্রতিনিধি, গাজীপুর অঞ্চল : আলহাজ্ব জায়দুল কবির ভাঙ্গী
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি : মিনহাজুল আবেদীন পলাশ
বার্তা সম্পাদক : মোহাম্মদ দুলাল মিয়া